Monday, April 13, 2020

যতন মণ্ডলের জীবন: সন্মাত্রানন্দ





হেমন্তের পাতাঝরা অপরাহ্ণ পেরিয়ে সন্ধ্যার কাঁসাই নদীর কূলে আমার সঙ্গে আবার দেখা হল যতন মণ্ডলের। এর আগে সেই দেখা হয়েছিল হৃষিকেশের এক আশ্রমে। তখন যতনদা বড়ো বড়ো চুলদাড়ি রেখেছিল। গৈরিক কাষায় পরনে। আর এখন চুলদাড়ি ছোটো, একটা সাদা পাজামা আর একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা। নদীর দিকে মুখ করে বসে অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবছিল আকাশপাতাল যতনদা। আমাকে অতর্কিতে দেখে চমকে উঠল। তারপর  চিনতে পারল। হাসল। হাসিটা একই আছে। বলল, ‘কী ব্যাপার রে? তুই এখানে?’ 
কিন্তু হৃষিকেশের আশ্রমেই তো আর যতনদার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ না। আমার জীবনের একটা গোটা পর্বের সঙ্গেই তো যতনদা জড়িয়ে আছে। আমি আর যতনদা সন্তোষপুরে একই মেসে থাকতাম। আমরা দুজনেই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। যতনদার ম্যাথামেটিক্স আর আমার স্ট্যাটিস্টিক্স। সায়েন্স কলেজের সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকিটা সময় দুজনেই টিউশন করে মেসের আর পড়ার খরচ চালাতাম। একই সঙ্গে ট্রেন ধরা, সন্ধেবেলায় মেসের বাজার করা, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, তাস-পেটানো—সবই প্রায় একসঙ্গে। 
গড়পড়তা জীবনের মধ্যে বেঁচে থাকতে থাকতে তবু কখনও কখনও আমার মনে হত, যতনদার ভেতরে একটা অন্যরকমের মানুষ আছে। কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে পড়ত। কিছুক্ষণ পর বোধহয় বুঝতে পারত, অনেক দূরে কোথাও সে চলে গিয়েছিল মনে মনে। চলমান কথার স্রোতে ফিরে আসত লজ্জিত, অপ্রতিভ মুখে। বাজারে হাটে রাস্তায় ট্রেনে যেকোনো শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশেও যেতে পারত অদ্ভুতভাবে। কী একটা অতল বিষণ্ণতা লেগে থাকত তার চোখে। কখনও কখনও মনে হত, সে শুধু চেয়ে আছে; কিন্তু দেখছে না।     
কোনো কোনো দিন সন্ধ্যা পেরিয়ে সুকান্ত সেতুর উপর দিয়ে বাসে করে আসতে আসতে জানালায় মুখ রেখে হঠাৎ-ই আবিষ্কার করেছি, ব্রিজের একধারে বড়ো আলোর নীচে জমে থাকা বিষণ্ণ হলুদ অন্ধকারের ভিতর যতনদা রেলিঙে ভর দিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছে। তার চুলের ভিতর খেলা করছে দক্ষিণ কলকাতার বিষাদময় রাতের বাতাস। অনেক দূরে টিভি টাওয়ারের লাল আলো আর যাদবপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া লোকাল ট্রেনের বিলীয়মান শব্দ...
সেই যতনদার সঙ্গে সন্তোষপুরের পর দেখা হল একেবারে হৃষিকেশে। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘যতনদা! তুমি এখানে?’
—কেন? তুই বিবাগী হয়ে যেতে পারিস, আর আমি পারি না?
আমি বললাম, ‘না, না, তা কেন? কিন্তু...’
—তুই মেস ছেড়ে চলে গেলি কাউকে কিচ্ছু না বলে। খোঁজখবর লাগালাম। কিছুদিন পর জানলাম, ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়ে গেছিস। লাপাত্তা। আমারও কয়েক বছর আরও কাটল সন্তোষপুরে। ডাব্লুবিসিএস-এ পেলাম। পরীক্ষার রেজাল্টফেজাল্ট বেরোলো। বাড়ি গেলাম। সবার খুব উল্লাস। সেই উল্লাসের মধ্যে কেন জানি হঠাৎ তোর কথা মনে পড়ল। কোথায় আছিস, কী খাচ্ছিস, কেন গেলি...এইসব। তারপর কী যে হল, মনে হল, আমিও চলে যাই। কী হবে চাকরিবাকরি করে? দেখি না, কী আছে জীবনে। একটাই তো জীবন। অন্যরকম করে বেঁচে দেখি না কেমন লাগে, কী পাই। সেই থেকেই... তুই কোথায় এখন? 
—আমি মঠে আছি। এসেছিলাম এমনিই এদিকে। তুমি দেখছি, গেরুয়া পরে আছ। সন্ন্যাস নিলে কবে? কোথা থেকে?
—বছর দুই হল। কৈলাস আশ্রম থেকে। মঠমড়িতে পোষায় না...অত নিয়মকানুন... তার থেকে এই ভালো। একা একা নিজের মতো ঘুরে বেড়াই। এই আশ্রমে আছি দিন পনেরো হল। এবার চলে যাব। বদরিকাশ্রম যাওয়ার ইচ্ছে আছে। দেখি কী হয়... রাহাখরচ যদি মেলে...যাবি নাকি তুই আমার সাথে? চল, একসঙ্গে ঘুরে আসি।
—না গো, আমি ভাবছি, নামব। বৃন্দাবন যাব। 
—আরে উঠলি কোথায় যে নামবি? এই তো সবে হৃষিকেশ! হা হা হা!
—ভালো বলেছ। আমার ওঠা আর নামা! শালগ্রাম চিত করে বসালেও সোজা, কাত করে শোয়ালেও সোজা। যাই, বৃন্দাবন থেকে ঘুরে আসি। বদরিকাশ্রম না হয় পরে হবে। বৃন্দাবন থেকে আগ্রা যাব। 
—হ্যাঁ, আগ্রা গিয়ে একটা নাগরা কিনবি। তারপর হবে পায়ে ফোস্কা। বৃন্দাবন কী গরম এখন জানিস? আর যা বাঁদরের উৎপাত। সাবধান না হলে বাঁদরে তোর চশমা কেড়ে নেবে।
এইসব হাবিজাবি কথা খানিক হয়েছিল। বিকেলে চলে এসেছিলাম। ভিতরের কথা কিছুই হল না। দুয়েকবার সেইদিকে কথার সলতে উস্কে দিয়েও বিশেষ লাভ হয়নি। কেন সে ঘর ছাড়ল, ছেড়ে কী পেল, কী খুঁজছে—এসব জানা হল না কিছুই। এমনিতেই সাধুরা ভিতরের কথা ভিতরেই রাখতে ভালোবাসে। আর যতনদার তো আছে সেই অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়ার রোগ।   
ভাবলাম, আমারই বা কী দরকার? আমি নিজে কী পেলাম, কী খুঁজছি—তা কি বোঝাতে পারব সহজ লোকের ভাষায়? কিছুই হয়ত নয়, আবার হয়ত অনেক কিছুই। নিজেই যখন বলতে পারি না বুঝিয়ে, তখন যতনদাই বা কী বলবে? বললেও সে হবে উপরের কথা, ভিতরের কথা তো নয়! দুধ যদি এতদিনে খেয়েও থাকে বোবা, কেমন করে বোঝাবে সে দুধের স্বাদ? আর যদি বোবা না-ও হয়, তবুও কি বোঝানো যাবে ভাষা দিয়ে দুধ খেতে কেমন? যদি বা বোঝানোও যেত, তাহলেও যাকে বলবে, সে হচ্ছে কালা। বক্তা বোবা, শ্রোতা কালা, জমেছে বেশ দরদের জ্বালা! দরদী কই? দরদী কেউ নেই! 
সেই যতনদা! আজ এতবছর পর কাঁসাই নদীর ধারে। পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, মাথার চুল উসকোখুসকো। বড়ো বড়ো ফিকে রঙের ঘাসবনের ভিতর উদাস হয়ে বসে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘বোস। দাঁড়িয়ে রইলি কেন?’
—তুমি ফিরে এলে?
—না।
—ফেরোনি?
—না।
—তাহলে এমন যে?
—এমনই। ওদিকটা দেখলাম, আবার এদিকটা দেখছি।
—বাড়িতে আছ? 
—না রে! এখানে এক বন্ধুর বাড়ি। চলে যাব পরশু। গাইঘাটা যাব। যাত্রা আছে। অনেকদিন যাত্রা দেখিনি।
—কোথায় কেদারবদ্রী করে ঘুরে বেড়িয়েছ, এখন গাইঘাটার যাত্রা? পোষাবে? 
—কেন নয়? কেদার যেমন সত্যি, গাইঘাটাও তেমনই সত্যি। গাইঘাটার যাত্রা যে অর্থে মিথ্যা, কেদারও সেই অর্থে মিথ্যা। নয় কি?   
মাথা নীচু করে ভাবছিলাম। কাঁসাইয়ের চরের উপর খয়েরি ডানার কী পাখি থুপথুপ থুপথুপ করে লাফাচ্ছিল। নদীর বুক থেকে বালির চর মাথা উঁচু করে রেখেছিল। সন্ধ্যার অন্ধকার মিশে যাচ্ছিল নদীর জলে। কতোদিন আগের সেই যতনদা। যতন মণ্ডল। সন্তোষপুরের সেই মেস। তারপর হৃষিকেশে দেখা। তারপর এই কাঁসাইয়ের ধারে। জীবনটাই একটা গল্প-ভাঙার গল্প। গল্প হয়ত নয়। হয়ত একটা উপন্যাস। গণনাতীত অধ্যায়। একই সঙ্গে রয়েছে। একটা অধ্যায়ে যতন মণ্ডল সুকান্ত সেতুর উপর উদাসীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটা অধ্যায়ে গেরুয়া জোব্বা পরে বসে আছে হৃষিকেশের আশ্রমে। আরেকটায় সাদা কাপড়ে কাঁসাইয়ের চরে বসে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছে জলের দিকে। 
নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তবে কি তুমি ঘরেও নেই, পারেও নেই?’
—নাহ্‌। কোথাও নেই তো!
—তাহলে তো খুব কষ্ট গো!
—হ্যাঁ রে, কষ্ট। খুব কষ্ট। আবার খুব আনন্দও। কোথাও বাঁধা না-পড়ার আনন্দ।
—বাঁধা পড়ারও তো একপ্রকার সুখ আছে, যতনদা। আছে না?
—আছে। তবে সেটা চলে যায়।
—আচ্ছা, কোনোভাবে ধরে রাখা যায় না?   
—যায় বোধহয়। যে বাঁধা পড়েছে আর  যে বেঁধেছে, যদি তারা দুজনেই একথা জানে যে, এই বাঁধন একটা ছল— যেকোনো মুহূর্তেই এ বাঁধন ছেড়ে তারা চলে যেতে পারে, তাহলেই একমাত্র ধরে রাখা যায় বোধহয়।
— ‘বোধহয়’ বলছ কেন? এমন কাউকে পাওনি?
—কই আর পেলাম? তুই কি পেলি? কী পেলি? 
সহসা কাঁসাইয়ের রেলব্রিজের উপর দিয়ে ঝমঝম ঝমঝম ধাতব শব্দ তুলে সন্ধ্যার লোকাল ট্রেন এসে পড়ল। তার প্রচণ্ড আওয়াজের ভিতর, সন্ধ্যার অন্ধকারের ভিতর আমাদের কথা—যতনদা আর আমার প্রশ্ন, আমার আর যতনদার উত্তর, আমি আর যতনদা ক্রমশ একাকার হয়ে ডুবে যেতে লাগলাম।     

 
 

 

3 comments:

  1. একটি সারবান অথচ কী নির্ভার লেখা। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

একনজরে

সম্পাদকীয়

একটি বিষয়ে আমাদের সকলের একমত হতেই হবে ভিন্ন মতের ও ভিন্ন রুচির বহুস্তরকে সম্মান জানিয়েও, যে, আমরা এই মুহূর্তে প্রায়শ্চিত্ত করছি। মানুষ...

বেশিবার পড়া হয়েছে যেগুলি