Monday, April 13, 2020

করোনামাহাত্ম্য পাঁচালি : যশোধরা রায়চৌধুরী





হিন্দোল বাবু বলিয়াছেন করোনা লইয়া কবিতা লেখা চলিবে না। তবে এ বাঙালি করে কী? সেই মেট্রোপলিটান যুগ হইতে, এথেনিয়াম ইনস্টিটুশনের মাস্টারমশাইয়ের আমল হইতে কবিতা লিখিতেছি, এবার না লিখিয়া পারি?

হে করোনা অতিমারী
আমি কি ভুলিতে পারি
 আজি হতে শতবর্ষ আগে সেই  স্প্যানিশ ফ্লু
সেই তোর মাতামহী
কোভিডে প্রভেদ নাহি
ধনী ও গরিবে সবে ডেকে বলে  : ত্রাহি ত্রাহি
আপামর নরকুল হল বেয়াকুব  তাহে  নাহি কোন ক্লু!

দ্যাখ না দ্যাখ কী চমৎকার কবিতা নামাইয়া ফেলিলাম, এইরূপে সকল বাঙালি একটি একটি নামাইলে টেস্ট কিটের বা পি পি ইর তুলনায় বেশি সংখ্যক হইবে। তাহার পর প্রদীপ জ্বালাইয়া কি থালাবাসন বাজাইয়া সেই কবিতা সবাই মিলিয়া গান করিয়া গাহিব, তাহাতে ভাইরাসের সাধ্য কী , না পালাইয়া!!!


মার্চ ২০২০
 আমাদিগের ন্যায় বয়স্থ ব্যক্তিগণের মনে পড়িবে, আশির দশকে পাড়ায় পাড়ায় ভাইরাল ফিভারের চল উঠিয়াছিল। শরীরে বিষব্যথা, প্রচন্ড জ্বর। সাতদিন হইলেই পগার পার। এক এক পরিবারে সকল মেম্বার শয্যাশায়ী। কেহ বাস বা কেহ ট্রেন হইতে আনিল, বাকিরা ভুগিল।  তখন হাত ধুইবার আর সেলফ আইসোলেশনের বিধানগুলি জানিতাম না। কেহ কেহ বৃদ্ধ বুজুর্গ ব্যক্তি রেস্পিরেটরি পাকে পড়িয়া ভোগের ওপারে চলিয়া গেলেও নাম ছিল না তাই গণনাও ছিল না। আমপোড়ার সরবত, মশারি ইত্যাদিই তখন  কাজে দিত। অকারণ ডাক্তারখানায় যাইতাম কদাচিৎ কেহ কেহ।  কিশোরী আমি এই করিয়া করিয়া এক ধেড়ে ডাক্তারের প্রেমেও পড়িয়াছিলাম কিছুদিনের জন্য। সে কেবল স্টেথো বসাইত। তখন বাঙালির খুব নতুন নতুন অ্যন্টিবায়োটিক পাইয়া শখ হইয়াছে। তাই  ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিল সিফ্রান টিফ্রান নামের অ্যান্টি বায়োটিক। হরি বোল এখন শুনি অ্যান্টি বায়োটিক সব আদতে ব্যাক্টিরিয়া ঘটিত রোগের, ভাইরাসের ঔষধ নাই, কেবল সাবানজল।
সাবানজল খুব খানিকটা গুলিয়া খাইতে পারিলে বাঁচিতাম। তাহা ত নয়, ডানপিটে ছেলের দল আবার ভ্যাক্সিন, সাবান আর মোমবাতি গুলাইয়া ফেলিয়া আবার নতুন নতুন কেচ্ছাকীর্তি স্থাপিত করিতেছে।

এপ্রিল ২০২০
তা আশি দশকের ভাইরাল ফিভারেরা হঠাৎ উবিয়া গিয়াছিল। বালককুল যাহারা ৯০ তে জন্মগ্রহণ করিয়াছে তাহারা জন্ম হইতে শুনিয়াছে ভাইরাস একরকম কম্পিউটার ঘটিত বস্তু। বুঝিবা গেম কোন। ইশকুলের ক্লাস ফোরের কম্পিউটার পেপারের প্রশ্নপত্রে আসিত । ওয়াট ইজ ফ্লপি ডিস্ক। ওয়াট ইজ ভাইরাস।
 হঠাৎ এই সব নব্য শিক্ষা, চিনা জাপানি ফ্লু ইত্যাদির ২০১০ পরবর্তীতে ফ্যাশন উঠিল। এইচ ওয়ান এন ওয়ান, জিকা, ইবোলা, নিপা… সার্স। তথাপি আমাদিগের এতটা চেনাশুনা হয়নাই।  ভাইরাস কীরূপ দেখিতে হয়, তাহার লিপিড প্রোফাল কেমন হয়, ছেঁদা করিতে সাবান প্রযোজ্য, আর নতুবা অ্যালকোহল... ভাইরাসের ক্রমবিবর্তন, কনস্পিরেসি থিওরি ইত্যাদি ইত্যাদির এই পাঠ তবু আমরা পাইনাই। ইদানীং মোটকা সোটকা গোলগাল খেলনার ন্যায় ভাইরাসের ছবি দেখিয়া ইহা সার বুঝিয়াছি পৃথিবীতে হিরো নম্বর এক এই নোভেল করোনাই। ইহার মুখচ্ছবি ইকনমিস্ট হইতে লা ভোগ সবের প্রচ্ছদে।
ওয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির একদল অধ্যাপক এদানী কেবল এই ভাইরাস লইয়াই লিখিতেছেন। সত্যজিত রায় রবীন্দ্রনাথ গান্ধি প্রমুখ ভাইরাস সম্বন্ধে কী কী বলিয়া গিয়াছেন তাহাও লিখিতেছেন খুঁজিয়া খুঁজিয়া। আমরা পড়িয়া ক্ল্যাপ দিতেছি, ক্ল্যাপ।

২০২০ অক্টোবর
 পূজা আসিতেছে। আনন্দময়ীর আগমনে প্রায় সকল পূজার থিমই করোনা-উমা সংবাদ বা করোনাকালিকা… অকরুণা-করোনা নামে নতুন যাত্রাপালা আসিল… সবই ভার্চুয়াল। কলিকাতায় পূজা হইবে ইউটিউবে, যাত্রাপালা ফেসবুক লাইভে। লকডাউন চলিতেছে, চলিতেছে, চলিতেছে। ব্লকবাস্টার শোলের ন্যায় করোনা নামক ছায়াছবির একবার আসন গাড়িয়াছে আর উঠিয়া যাইতেছে না।
এখন ব্যবসা করিতে হইলে সাবানের কোম্পানি খোল। সাবান আর হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বাজার ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিয়াছে। উকিলে আর মামলা লড়িতে যায়না, মামলা কেহই করেনা, কোর্ট ও বসেনা। উকিল সকাল সকাল উঠিয়া গামলায় কেমিক্যাল ঢালিয়া হ্যান্ড ওয়াশ বানায় আর বোতলে ভরে।
প্রকাশকদেরও দিন গিয়াছে। ইত্যবসরে, কলেজ পাড়ার নতুন নাম হইয়াছে টিস্যু পাড়া। বইয়ের দোকানগুলি লাটে উঠিতে উঠিতে ওঠে নাই। প্রতি পুস্তক প্রণেতা এখন  সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি ব্লিচিং সর্বস্ব জলে চোবাইয়া, কাগজের মন্ডগুলি টিস্যু পেপারে রূপান্তরিত করিতেছেন। নাটক নবেলের বাজার গিয়াছে, কেবল টিস্যুর বাজার আছে।
অনুরূপ, শাড়ি জামা ডিজাইনার কাপড়চোপড়ের দোকানে এখন কেবলমাত্র মাস্ক বিক্রি হয়। পাতলা মাস্ক, মোটা মাস্ক, লাল মাস্ক সাদা মাস্ক, টুপির ন্যায় মাস্ক, রুমালের ন্যায় মাস্ক। নব নব উন্মাদনায় নতুন ধরনের মাস্ক রোজ উৎপাদিত হইতেছে।  সদ্য সকল মুখ ঢাকা মাস্ক বাহির করিয়াছেন তুরি কুমার, বশ্যশাচী মুখোপাধ্যায়রা। মুখমন্ডলে আঁকিবুঁকি, অ্যাবস্ট্রাক্ট চাহিলে তাইই, নাহইলে পৌরাণিক চিত্রও পাইবেন।। ঐশ্বর্য বা দীপিকার মুখচ্ছবি সম্বলিত মাস্ক ও হটকেকের ন্যায় বিক্রয় হইতেছে।
আমলারা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করিতেছেন। প্রচুর জুম অ্যাপে মিটিং করিতেছেন। এক এক মিটিং এ পৃথিবী উদ্ধারের এক এক প্রকল্প হইতেছে। অনেকেই ভবিষ্যৎ দিশা বাহির করিতেছেন বাড়িতে বসিয়া। অংকের মডেল পাতিতেছেন, যন্ত্রগণক আজ ভাগ্যগণক হইয়াছে। জ্যোতিষীর স্থান নিয়াছেন এপিডেমিও লজিস্ট ও স্ট্যাটিস্টিকস বিশারদ একযোগে। এক এক মডেলে এক এক ফলাফল আসিতেছে। অ্যালগরিদম পালটাইয়া পালটাইয়া ডেটা চিবাইয়া চিবাইয়া থালার পাশে ছিবড়ার স্তূপ জমিতেছে।
সর্বাধিক ভাল ব্যবসা করিয়া লইয়াছে গায়ক নর্তক নাট্যব্যক্তিত্বের দল। ইহারা লাইভে আসিয়া দেড় হাজার দুহাজার ভিউ পাইয়া তৃপ্ত। টিকিট কাটিয়া হলে আসিত না কেন এত চেলাচেলির দল? ফ্যান ত হদ্দমুদ্দ করিতেছে লাভ সাইন দিতে দিতে। প্রতি লাইভে হৈ হৈ পড়িয়া যাইতেছে।
আর ব্যবসা করিতেছে নতুন অ্যাপের দল।  চালু হইয়াছে চুম্বন অ্যাপ ও আলিঙ্গন অ্যাপ। দুইটি পুতুল ভার্চুয়ালি পরস্পরকে আদর করিতেছে বোতাম টিপিলেই। অনন্তবার আদর করিতেছে, একশোবার চুম্বন করিতেছে। প্রাগৈতিহাসিক ঔপন্যাসিকের ন্যায় গুনিয়া গুনিয়া তেরোটি চুম্বন আঁকিতেছে সারা শরীরে, প্রেমিক প্রেমিকার অথবা ভাইসি ভার্সা।
এইরূপ আরো অনেক অ্যাপ তৈয়ার হইয়াছে। এক অ্যাপে জামাকাপড় খুলিয়া নেওয়ার জনয বোতাম। অন্য বোতামে , ধর্ষণ । আরেক বোতামে, হাত পা কাটিয়া লওয়া এইসব।
সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং এর জন্য সব ধর্ষক বাড়িতে আছে। কেবল এইসব খেলা খেলিতেছে। ফর এ চেঞ্জ , মেয়েগুলি বাঁচিয়া গিয়াছে।
তবে ছিঁচকে চোরেদের সুবিধা হইতেছে। আজিকালি প্রতি অশ্লেষা মঘা অমাবস্যায় ঢং ঢং বাদ্য বাজাইয়া আর লাইট অফ করিয়া প্রদীপ জ্বালাইয়া স্টে হোমের সলিডারিটি জানানো হইয়া থাকে।
 প্রথম প্রথম গ্রিড বসিয়া যাইত, এখন সকলের ন্যায় গ্রিডেরও গার্গল করা অভ্যাস হইয়া গিয়াছে। যতক্ষণ লাইট অফ থাকে চোরেরা কলাটা মূলাটা চুরি করিয়া বেড়ায় । অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়া।

৫।
অক্টোবর ২০৪০
 পৃথিবী হইতে চুম্বন ও আলিঙ্গন দুইটি বস্তু উঠিয়া গিয়াছে। কোন চুম্বন, আলিঙ্গন,  বাস্তবে আর নাই। একদা মাস্টারে কানমলা দিত, এই তথ্য যেমত কেবলই কাহিনি পুস্তকে আছে, কেহই দেখে নাই কোন মাস্টারকে কানমলা দিতে, সেইরূপ , প্রাচীন সাহিত্যে চুম্বন ও আলিঙ্গন আদি শব্দবন্ধ পাওয়া যায়।
করমর্দন নামে একটি শব্দকে রেগুলার ডিকশনারি হইতে সরাইয়া , প্রাচীন ও তামাদি শব্দের ডিকশনারিতে স্থান দেওয়া হইয়াছে।
নমস্কার করিবার  ভারতীয় ও  জাপানি পদ্ধতি এখন সর্ব বিশ্বে গৃহীত। কে না জানে যে জাপানিরা ভারতীয়দের হইতে শিখিয়াছিল। আমাদের বুদ্ধদেব উহাদের শিখাইছিল। আপাতত  ভারতীয়রা অপেক্ষায় আছে, মাউন্ট ফুজি আরেকবার তেরিয়া হইয়া উঠিলে বা আরেকটা জব্বর ভূকম্পে পুরো জাপান দ্বীপপুঞ্জ ডুবিয়া গেলে, ভারতই জগতসভায় রাজত্ব করিবে।
বলিয়াছিলাম কিনা, সর্বশ্রেষ্ঠ বৈদিক যুগ আসিতেছে? শুচিবায়ুগ্রস্তা ঠাকুমাদের লইয়া হাসিঠাট্টা? সারা জগত এখন স্পর্শ ভয়ে কাঁপে, সাবান চৌষট্টি টুকরা করিয়া হাত ধোয়!





9 comments:

  1. আহ্, অসম্ভব স্বাদু।

    ReplyDelete
  2. ভীষণ ভীষণ ভালো

    ReplyDelete
  3. সবাইকে ধন্যবাদ

    ReplyDelete
  4. চমৎকার লাগলো। নতুন স্বাদের।

    ReplyDelete
  5. চমৎকার লাগলো। নতুন স্বাদের।

    ReplyDelete
  6. যশো দি ই পারেন এমন করে লিখতে ।নাহ আরো কয়েকবার পড়তে হবে

    ReplyDelete

একনজরে

সম্পাদকীয়

একটি বিষয়ে আমাদের সকলের একমত হতেই হবে ভিন্ন মতের ও ভিন্ন রুচির বহুস্তরকে সম্মান জানিয়েও, যে, আমরা এই মুহূর্তে প্রায়শ্চিত্ত করছি। মানুষ...

বেশিবার পড়া হয়েছে যেগুলি